আজ ৮ই মাঘ, ১৪২৭ বঙ্গাব্দ, ২২শে জানুয়ারি, ২০২১ খ্রিস্টাব্দ

বাংলাদেশ মুজাহিদ কমিটি ও আমীরুল মুজাহিদীন প্রসঙ্গ

সামছা আল ইসলাম ভূঁইয়া : সবার আগে জিহাদ কি সেটা তুলে ধরা প্রয়োজন। তাই জিহাদের আলোচনা দিয়েই লেখাটি শুরু করছি।
জিহাদ শব্দের আভিধানিক অর্থ হল সর্বোচ্চ চেষ্টা করা, সাধ্যের শেষ সীমা পর্যন্ত প্রচেষ্টা অব্যাহত রাখা, কঠিন শ্রম ও শক্তি ব্যয় করা, কঠোর সাধনা ও কষ্ট স্বীকারে নিজেকে প্রস্তুত করা।
ইসলামী শরীয়তের পরিভাষায় জিহাদ বলা হয়-
আল্লাহর কালিমার বিজয় ও প্রতিষ্ঠা সাধনের লক্ষ্যে সর্বোচ্চ চেষ্টা, কষ্ট-ক্লেশ ও ত্যাগ স্বীকার করা। এবং তার শেষ স্তর হলো কাফেরের বিরুদ্ধে শস্ত্র সংগ্রাম করা।
জিহাদের লক্ষ্য হলো, প্রচলিত মতবাদী সমাজ, রাষ্ট্র ও সাংবিধানিক ব্যবস্থার অবসান এবং ইসলামী হুকুমত প্রতিষ্ঠা, সংরক্ষণ, সমৃদ্ধি ও বিস্তৃত করাই।
জিহাদ দুই প্রকারঃ
১. জিহাদে আকবার
২. জিহাদে আসগার
রাসূল সাঃ অপ্রকাশ্য শত্রু নফস ও শয়তানের বিরুদ্ধে জিহাদ করাকে জিহাদে আকবার বলেছেন। রাসূল সাঃ তার কর্মী বাহিনীকে নফসের খায়েশ ও শয়তানের আত্মপ্রবঞ্চনা থেকে মুক্ত করে আল্লাহর জন্য নিবেদিত করেছিলন। কারণ নফসের খায়েশ আর শয়তানের প্রবঞ্চনা নিয়ে আর যাই হোক খোদার রাহে জান দেওয়ার মানসিকতা তৈরি হতে পারে না।
আর প্রকাশ্য শত্রু কাফির, মুশরিক, মুনাফিক ও জালিমদের বিরুদ্ধে জিহাদ করাকে জিহাদে আসগার বলেছেন। কারণ নফসের খায়েশ ও শয়তানের প্রবঞ্চনা মুক্ত খোদামুখী বাহিনী দিয়ে বিজয় অর্জন করা কোনো ব্যাপারই নয়।
সবসময় রাসূলের সাঃ এর বাহিনী সংখ্যায় কম এবং দূর্বল ছিল কিন্তু বিজয়ের সংখ্যা বেশি ছিল।
তারপরও একটি প্রশ্ন আসতে পারে কেন প্রকাশ্য শত্রুর চেয়ে অপ্রকাশ্য শত্রুর সঙ্গে জিহাদ করাকে বড় জিহাদ বলা হয়েছে?
আমাদের এই প্রশ্নের উত্তরে আল্লাহ তায়ালা কুরআনে বলেছেনঃ জিহাদ করো আল্লাহর জন্য। যেমনিভাবে জিহাদ করা উচিত (হজ্ব, আয়াতঃ ৭৮)। উক্ত আয়াতের তাফসীরে ইমাম কুরতুবী
রহ. লিখেনঃ তোমরা জিহাদ করো তোমাদের নফসের বিরুদ্ধে। তাকে আল্লাহর অনুগত বানানো এবং লালসা, কামনা, বাসনা থেকে বিরত রাখার জন্য। শয়তানের বিরুদ্ধে জিহাদ কর তার প্ররোচনা প্রতিহত করার লক্ষ্যে। জালিমদের বিরুদ্ধে জিহাদ কর জুলুম বন্ধ করার জন্য এবং কাফিরদের বিরুদ্ধে জিহাদ কর তাদের কুফরীকার্য প্রতিরোধ করার উদ্দেশ্যে। এবং হাদীস শরীফে বলা হয়েছে, যে লোক স্বীয় নফসকে আল্লাহর অনুগত বানাবার লক্ষ্যে জিহাদ করল, সে একজন প্রকৃত মুজাহিদ (মুসনাদে আহমাদ)।
জানা দরকার যে প্রকাশ্য জিহাদের স্তর তিনটি।
সমাজ, রাষ্ট্র ও সাংবিধানিকভাবে প্রতিষ্ঠিত অন্যায়কে মূলতপাটনের লক্ষ্যে পরিকল্পনা প্রণয়ন জিহাদের প্রাথমিক স্তর। দ্বিতীয় স্তর হলো মৌখিক শক্তি বা বাকশক্তি প্রয়োগ। তৃতীয় স্তর হলো বাহুশক্তি প্রয়োগ। সত্য, ন্যায় ও শান্তি প্রতিষ্ঠাই জিহাদের দাবী। “তোমরা মুশরিকদের বিরুদ্ধে জিহাদ কর তোমাদের ধন-সম্পদ, জান-প্রাণ ও বাকশক্তি (ভাষা ও সাহিত্য) দিয়ে” (আবু দাউদ)।
জিহাদের শর্ত হলো ঈমানের তাগিদে ও ঈমানের ভিত্তিতে জিহাদ হতে হবে। যে জিহাদের পশ্চাতে ঈমানের তাগিদ নেই এবং ঈমানের ভিত্তিতে যে জিহাদ পরিচালিত হয় না, তা কখনই ইসলামী জিহাদ হতে পারে না। জিহাদের লক্ষ্য, পথ-পদ্ধতি হতে হবে ফী-সাবীলিল্লাহ। “ঈমান আনবে আল্লাহ ও তার রাসূলের ওপর এবং জিহাদ করবে আল্লাহর পথে (সুরা সফ, আয়াতঃ ১৯)।
এখন বুঝতে হবে যে প্রকাশ্য জিহাদ দুভাগে বিভক্তঃ
১. আক্রমণাত্মক জিহাদ
২. আত্মরক্ষামূলক জিহাদ
ইসলামী শরিয়তে আক্রমণাত্মক জিহাদ ফরজে কিফায়া। মানে রাষ্ট্রে কিছু সংখ্যক লোক জিহাদে অংশ নিলেই সবার পক্ষ থেকে জিহাদের হক আদায় হবে। আক্রমণাত্মক জিহাদের হুকুম ইসলামী খিলাফতের পরবর্তী অবস্থায় প্রযোজ্য।
ইসলামী খিলাফতের সংহতি ও মজবুতি বজায় রাখা এবং পরিধি বিস্তৃত করার স্বার্থে আগ্রগামী হয়ে জিহাদ করা।
আর আত্মরক্ষামূলক জিহাদ সর্বদাই ফরজে আইন। মানে রাষ্ট্রে কিছু সংখ্যক লোক জিহাদে অংশ নিলেই সবার পক্ষ থেকে জিহাদের হক আদায় হবে না। কাফির ও তাগুত শত্রুর আক্রমণে ঈমান, ইসলাম ও মুসলিম ভূখন্ড আক্রান্ত হলে পর্যায়ক্রমে আবাল-বৃদ্ধ-বণিতা সকলের জন্যই জিহাদ ফরজে আইন হয়ে যায়। এবং কোনো মুসলিম ভূখন্ডে কুফরী মতবাদ প্রতিষ্ঠিত থাকলে, তাগুতি শাসনব্যবস্থা বহাল থাকলে, সেই ব্যবস্থাপনাকে উৎখাত করে আল্লাহর শাসন ও সার্বভৌমত্ব প্রতিষ্ঠা করা ফরজে আইন।
জিহাদের আলোচনা থেকে আমরা বুঝতে পারলাম যে, যারা প্রকাশ্য ও অপ্রকাশ্য শত্রুর বিরুদ্ধে জিহাদ করে তারাই হলো মুজাহিদ। যার অর্থ সর্বোচ্চ চেষ্টাকারী।
চলুন এখন দেখি চরমোনাইর মুজাহিদরা আসলেই মুজাহিদ কি না। আমরা জেনেছি- প্রকাশ্য ও অপ্রকাশ্য শত্রুর বিরুদ্ধে আল্লাহর পথে সংগ্রামকারীকে মুজাহিদ বলে। আর চরমোনাইর মুজাহিদরা আল্লাহর ফযলে উভয় শত্রুর মুকাবিলায় সদা ততপর। কলেজ-ভার্সিটির বহু ছাত্র মুজাহিদ নফসের বিরোধীতা করে মুখে দাড়ী, গোল পাঞ্জাবী ও মাথায় পাগড়ী পরিধান করে। যে সময় বহু বিজ্ঞ আলেমরা পর্দার হুকুম লংঘন করে বেগানা নারীর সঙ্গে ইফতার করে সে সময় চরমোনাইর বহু যুবক মুজাহিদ শয়তানের প্ররোচনাকে উপেক্ষা করে পর্দার হুকুমকে পালন করে। এগুলো কি অপ্রকাশ্য শত্রুর বিরুদ্ধে জিহাদ নয়? অবশ্যই এগুলো অপ্রকাশ্য শত্রুর বিরুদ্ধে জিহাদ। ইসলাম, দেশ ও মানবতার ডাকে সাড়া দিয়ে চরমোনাইর মুজাহিদরা সবার আগে ঘর থেকে বেরিয়ে আসে। যার উজ্জল দৃষ্টান্ত হলো টিপাইমুখ বাধ অভিমুখে লংমার্চ, মিয়ানমার অভিমুখে লংমার্চ, মুক্তাঙ্গনের মহাসমাবেশ ও গণঅবস্থান, শাপলা চত্বরের জাতীয় মহাসমাবেশ এবং জাতীয় শ্রমিক সমাবেশসহ সারা দেশের শত শত কর্মসূচিগুলো। এগুলোর মাধ্যমে তারা প্রকাশ্য শত্রুর বিরুদ্ধে বাকশক্তি প্রয়োগ করে জিহাদ করে যাচ্ছে। এভাবেই প্রকাশ্য ও অপ্রকাশ্য শত্রুর বিরুদ্ধে জিহাদ করার জন্য চরমোনাইর মুরিদদেরকে দাদা হুজুর সৈয়দ এছহাক রহঃ মুজাহিদ বলতেন। মরহুম সৈয়দ ফজলুল করীম হুজুর সেই মুজাহিদদের জন্য যেই সংগঠন করেছেন তার নাম দিয়েছেন বাংলাদেশ মুজাহিদ কমিটি আর মুজাহিদ কমিটির আমীরের উপাধি নির্ধারণ করছেন আমীরুল মুজাহিদীন।
আপনাকে বুঝতে হবে, এটি কোনো সশস্ত্র বিপ্লবী সংগঠন নয়, রাজনৈতিক কোনো সংগঠন নয়। এটি একটি অরাজনৈতিক আধ্যাত্মিক ও ইসলাহী সংগঠন। হেফাজতের আমীর যেমন আমীরে হেফাজত তেমনিভাবে মুজাহিদ কমিটির আমীরও আমীরুল মুজাহিদীন।
এখনেও একটি প্রশ্ন আসতে পারে যে, একটি অরাজনৈতিক আধ্যাত্মিক ও ইসলাহী সংগঠনে থেকে অপ্রকাশ্য শত্রুর বিরুদ্ধে লড়াই করা গেলেও প্রকাশ্য শত্রুর বিরুদ্ধে তো সামরিক বা রাজনৈতিক সংগঠন ছাড়া সম্ভব নয়?
জী হ্যাঁ। বাংলাদেশ মুজাহিদ কমিটির একটি রাজনৈতিক সেল বা প্লাটফর্ম আছে। যার নাম “ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ”। মুজাহিদ কমিটির প্রতিটি সদস্যের জন্য ইসলামী আন্দোলনে সম্পৃক্ত থেকে প্রকাশ্য শত্রুর বিরুদ্ধে সংগ্রাম করা’আবশ্যক। এবং তাদের আমীরুল মুজাহিদীন যিনি হবেন তিনি পদাধিকার বলে ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ এর আমীর হবেন। একই আমীরের নেতৃত্বে তারা প্রকাশ্য ও অপ্রকাশ্য শত্রুর বিরুদ্ধে লড়াই করবে।
সমালোচনার কাল চশমাটা খুলে সাধারণ দৃষ্টিতে দেখলে মুজাহিদ কমিটি আর আমীরুল মুজাহিদীনকে বুঝতে আপনার কষ্ট হওয়ার কথা নয়।
লেখক :

সাধারণ সম্পাদক, ইসলামী যুব আন্দোলন বি-বাড়িয়া

আপনার মতামত দিন
3Shares

স্যোসাল মিডিয়াতে দেখুন আমাদের সংবাদ

Follow us on Facebook Follow us on Twitter Follow us on Pinterest 0

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

     একই ক্যাটাগরিতে আরো সংবাদ