আজ ১১ই মাঘ, ১৪২৭ বঙ্গাব্দ, ২৫শে জানুয়ারি, ২০২১ খ্রিস্টাব্দ

যাদের ত্যাগ আমাদের প্রেরণা যোগায়

শাইখ ফজলুল করীম মারুফ : মানুষের সাধারণ প্রবণতা হলো, মানুষ নেতৃত্বকে ত্যাগী দেখতে চায়, ভোগী না। “ভোগ” নিষিদ্ধ না হলেও সবসময়ই তা “ত্যাগ” এর তুলনায় কম নৈতিকতার বাহক।
হজরত উমর রাঃ খেজুর পাতার চাটাইতে বসেছিলেন বলেই হাজার বছর ধরে মানুষ সেটা মনে রেখেছে। উমর রঃ এর পরে কত শাসকই রেশমের আলিশান সিংহাসনে বসেছে কিন্তু ইতিহাস তাদের মনে রাখে নাই।
আহমাদিনেজাদের গণপরিবহনে করে অফিসে যাওয়ার দৃশ্য শ্রদ্ধার সাথে আলোচিত হয়। আর স্বর্ণেমোড়া বিমানে চড়া কুয়েতি আমীর অশ্রদ্ধায় আলোচিত হয়।
কতজনই তো ত্রাণ দিতে গিয়ে প্রাণপাত করছে কিন্তু ব্যাগে মাথা দিয়ে মুহতারাম মামুনুল হক আর ত্রাণের বস্তা কাঁধে দেলোয়ার সাকী ও বস্তা মাথায় ইলিয়াসরাই প্রেরণা জাগায়।
ইসলামী শাসনতন্ত্র ছাত্র আন্দোলন এর কেন্দ্রীয় সভাপতিদেরকেও দেখেছি, সারাদিনের পরিশ্রম শেষে রাতে বাসায় যাওয়ার জন্য ৮ নাম্বার বাসে দৌড়ে উঠছেন। ২০১১ তে কেন্দ্রীয় মজলিসে শুরায় এসে বৈঠকে জোড় দাবী জানালাম যে, কেন্দ্রীয় সভাপতির এভাবে দৌড়া-দৌড়ি করে লোকাল বাসে ওঠা যাবে না। গাড়ি না হোক তারা অন্তত রিক্সা ব্যবহার করুক। আমাদের জোড় দাবীতে তা পাশ হয়েছিলো কিন্তু খুব একটা বাস্তবায়ন হয় নাই।
আমার পরম শ্রদ্ধেয় একজন সহকারী মহাসচিবকে পল্টন মোড়ে বাসের জন্য দৌড়-ঝাপ করতে দেখে আমি লজ্জায় সেখান থেকে সরে এসেছি বহুবার। আমাকে দেখে যদি তিনি লজ্জা পান! প্রথমদিকে সরে এসে চোখ মুছতাম। এখন সয়ে গেছে!!
ইশা ছাত্র আন্দোলনের দীর্ঘমেয়াদী বিপ্লবী কেন্দ্রীয় সভাপতি, বর্তমানে ঢাকা মহানগরের শীর্ষ দুই নেতার একজন পল্টন মোড় থেকে দৌড়ে বাসে ওঠেন। অনেক সময়ই ঝুলতে ঝুলতে যান!
সাবেক জয়েন্ট সেক্রেটারি জেনারেল আজিজুল হক ভাই অফিস থেকে সদরঘাটে হেটে যেতেন। যানজটের কারনে বাসে উঠতেন না আর রিক্সা নিতেন না কারন কালেকশনে গিয়ে যদি টাকা না পান!!
সাবেক কেন্দ্রীয় সভাপতি আরিফ ভাইয়ের সাথে আমরা কালেকশনে যেতে চাইতাম না! কারন কখনোই তিনি রিক্সায় চড়তেন না।
প্রতি সপ্তাহেই কেন্দ্রীয় দ্বায়িত্বশীলগণ দেশের প্রান্তে প্রান্তে ছুটে যান কিন্তু এসি, ভলবো বাস কোনদিন কল্পনাও করেন না। সফরে পানি কিনতে ১৫ টাকা লাগবে বলে অফিসে পুরোনো বোতল রেখে দেয়া হয়, যাতে সফরের সময় পানি নিয়ে যাওয়া যায়।
দুরপাল্লার গাড়িগুলো মাঝপথে যাত্রা বিরতি দেয়। সময়টা আমরা ঘুমের ভান করেই কাটাই।
খুলনায় কর্মী তারবিয়াত চলছে। রাতের কার্যক্রম শেষ করে বারান্দায় এসে দাড়িয়েছি। খুলনা বিভাগের এক কর্মঠ জেলা সাধারণ সম্পাদককে দেখলাম, উদাস নয়নে আকাশের দিকে তাকিয়ে আছে। কাছে গিয়ে পিঠে হাত দিতে চমকে উঠলো। 
-মন খারাপ কেন?
-না ভাই! মন খারাপ না।
মায়া জড়ানো ধমক দিলাম। তার কণ্ঠ আর্দ্র হয়ে উঠলো।
“ভাই! এই তারবিয়াত উপলক্ষে আমরা সব থানায় সফর করেছি। গত শুক্রবারে আমার অমুক থানায় সফর ছিলো। সকালে বাসায় নাস্তা খেয়ে সফরে যাবো। পকেটে টাকা ছিলো না। আম্মার কাছে টাকা চাইতে মা একশ টাকা বের করে দিলেন। সফর শেষ করে জুমার পরে তিনটার দিকে বাসায় এসে দেখি আম্মা-আব্বা শুয়ে আছে। মুখটা খানিকটা শুকনো। আমি মার কাছে খাবার চাইতে মা উঠে এসে জানালেন, আজকে রান্না হয় নাই। ঘরে কিছু নাই। বিকালে এক লোক কিছু পাওনা টাকা দেয়ার কথা। সেটা দিলে রাতে রান্না।”
“মারুফ ভাই! আমি যদি সকালে ঐ একশ টাকা না নিয়ে যেতাম তাহলেও তো আব্বা-আম্মাকে না খেয়ে থাকতে হয় না!”
সেই জেলা সাধারণ সম্পাদককে কিছু বলার মতো কোন ভাষা আমি খুজে পাই নাই। আমিও উদাস নয়নে আকাশের দিকে তাকিয়ে কেবল এই প্রার্থনাই করেছি, হে আকাশের মালিক! তুমি এর প্রতিদান দিও!
প্রশিক্ষণ সম্পাদক থাকাকালীন চট্টগ্রাম বিভাগের এক জেলার থানায় থানায় একবার সফর করেছিলাম। এক থানায় তারবিয়াত চলছে। জোহরের নামাজের পরে খাবারের আয়োজন হলো। কিন্তু সেটা আমার একার। বাকিদের খাবারের ব্যবস্থা কি জানতে চাইলে থানা সভাপতি বললো, ওদের আলাদা ব্যবস্থা হয়েছে। আমিও আর বেশি জানতে চাই নাই। খাবারের পরে তারবিয়াত শুরু হলো। সবাই এমন ভাব করলো যে, তারা খেয়ে দেয়ে এসেছে। আছরের পরে তারবিয়াত শেষে রুমে এসে দেখি, সভাপতি ঢকঢক করে পানি খাচ্ছে। মুখও শুকনো। ও দুপুরে খেয়েছে কিনা সন্দেহ হলো। জোর জিজ্ঞেসা করতে জানা গেলো, সে সহ কেউই দুপুরে খায় নাই। টাকা ছিলো না!!
সেদিন দুপুরের খাবারের জন্য আজো আমার অনুশোচনা হয়।
এই হলো ইসলামী শাসনতন্ত্র ছাত্র আন্দোলন। বিপ্লবের মশালধারী ত্যাগীদের কাফেলা। এই কাফেলার জেলা ও শাখা পর্যায়ে যারা কাজ করেন তাদের ইতিহাস আরো মর্মন্তুদ! সেই ত্যাগের সামনে নিজেরা ছোট হয়ে যাই। লজ্জিত হই।
এরকম হাজারো ঘটনায় ইসলামী শাসনতন্ত্র ছাত্র আন্দোলন পথ চলছে। তাগুতের বিকট আস্ফালনে যখন বিপ্লবকে পরাহত মনে হয় তখন এই ত্যাগী কর্মীদের কথা মনে হয়। মনে আশার সঞ্চার হয়। এই ত্যাগ বৃথা যেতে পারে না। দিকে দিকে শ্লোগান উঠবেই
“ইনকেলাব,জিন্দাবাদ”
“আল ইসলাম, হুয়াল হল্ল”
লেখক : কেন্দ্রীয় সহ-সভাপতি, ইসলামী শাসনতন্ত্র ছাত্র আন্দোলন

আপনার মতামত দিন
0Shares

স্যোসাল মিডিয়াতে দেখুন আমাদের সংবাদ

Follow us on Facebook Follow us on Twitter Follow us on Pinterest 0

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

     একই ক্যাটাগরিতে আরো সংবাদ