আজ ১১ই আশ্বিন, ১৪২৭ বঙ্গাব্দ, ২৬শে সেপ্টেম্বর, ২০২০ খ্রিস্টাব্দ

রক্তের হরফে লেখা মালিবাগ শহীদ দিবস

কে এম শরীয়াতুল্লাহ || ২০০২ সালের ১৫ আগষ্ট। বিপ্লবীদের অনুপ্রেরণার বাতিঘর। রক্তের হরফে লেখা একটি দিন। আল্লাহর ঘর মসজিদ রক্ষার আন্দোলনে তৎকালীন ক্ষমতাসীন কথিত ইসলামী মূল্যবোধের বিএনপি-জামাত সরকারের হিংস্র আঘাতে সেদিন ঝরে গিয়েছিল ইসলামী শাসনতন্ত্র ছাত্র আন্দোলনের কর্মী শহীদ আবুল বাশার, সদস্য শহীদ রেজাউল করিম ঢালী সহ চারটি তাজা প্রাণ।

আপনারা জেনে অবাক হবেন যে, এমন ন্যাক্কারজনক ঘটনাটির সূত্রপাত ছিল একটি মসজিদ ভাঙ্গাকে কেন্দ্র করে। রাজধানী ঢাকার মালিবাগ টিএন্ডটি বায়তুল আজিম জামে মসজিদ। যা বর্তমানে শহীদী মসজিদ নামে নামকরণ করা হয়েছে। বিরানব্বই ভাগ মুসলমানের দেশে আল্লাহর ঘর মসজিদ ভেঙ্গে মার্কেট নির্মাণ করার দুঃসাহস দেখিয়েছিল তৎকালীন ক্ষমতাসীন দলের নেতারা। কিন্তু অত্যন্ত দুঃখ ও পরিতাপের সাথে বলতে হয় যে, তৎকালীন বিএনপি জোটে কথিত ইসলামী রাজনৈতিক সংগঠন থাকলেও তারা এর প্রতিবাদ জানানোর ভাষা হয়তো হারিয়ে ফেলেছিল ক্ষমতার মোহে। কিন্তু ইসলাম রক্ষার অতন্দ্র প্রহরী ইসলামী শাসনতন্ত্র ছাত্র আন্দোলন ক্ষমতাসীনদের চোখ রাঙানি ও হুমকি-ধমকি কে পরোয়া না করে রাজপথে আন্দোলনে নেমেছিল আল্লাহর ঘর রক্ষা করার জন্য। সে আন্দোলনের শহীদী কাফেলায় ইসলামী শাসনতন্ত্র ছাত্র আন্দোলনের কর্মী শহীদ হাফেজ আবুল বাশার, শহীদ রেজাউল করীম ঢালী, শহীদ ইয়াহইয়া এবং শহীদ জয়নাল আবেদীনকে নির্মমভাবে শহীদ হতে হয়। আনসারের গুলিতে আহত হয় আরো ৬০ জন। এভাবেই তাজা রক্তের বিনিময়ে সেদিন জোট সরকারের হিংস্র থাবা থেকে মসজিদ রক্ষা করতে হয়েছিল।

ইসলামী শাসনতন্ত্র ছাত্র আন্দোলনের তৎকালীন কেন্দ্রীয় সভাপতি আহমাদ আবদুল কাইয়ূম ভাই সেদিনের স্মৃতিচারণ করেন এভাবেই…

“১৫ আগষ্ট ২০০২ বৃহস্পতিবার মসজিদ রক্ষার দাবীতে অনুষ্ঠিতব্য মালিবাগের সামনে পুলিশ ও আনসারের গুলিতে শহীদ হওয়ার ঘটনায় আমি কয়েকজন সাথীকে নিয়ে মালিবাগ ঘটনাস্থলে গিয়ে শহীদদের না দেখলেও তাদের রক্তে রাজপথ রঞ্জিত এ দৃশ্য দেখে নিজেকে ঠিক রাখতে পারছিলাম না। পরে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে গিয়ে চার শহীদের লাশ দেখে চোখের পানি সংবরণ করতে পারিনি। রক্ত মাখা জামাসহ লাশের প্রতিচ্ছবি আজো ভেসে ওঠে চোখের সামনে। আর লাশ থেকে বেহেস্তের খুশবু আজো আমাকে নাড়া দেয়। আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয় হযরত সাহাবায়ে কিরামের কথা। তাদের তাঁজা রক্তে আজো দীন টিকে আছে। মহান আল্লাহর বাণী, “যারা আল্লাহর পথে মৃত্যুবরণ করে তাদেরকে মৃত বলো না; বরং তারা জীবিত। তোমরা তা বুঝতে পার না।” (সূরা আল বাকারা) আসলেই সেদিন শহীদদের লাশ দেখে মনে হয়নি তাঁরা মৃত। তাদের চেহারা আলোকিত ও হাস্যোজ্জ্বল। মনে হয় তাঁরা ঘুমিয়ে আছে। শহীদ ভাইদের কথা মনে হলে আজও নিরবে আত্মা কেঁদে উঠে, অশ্রুশিক্ত হয়ে যায় মন তখন ঠিক থাকতে পারিনা। যারা আমাদেরকে ঋণী করে রেখেছে তাদের জন্য যখন কিছু করা না যায় তখন ব্যথিত ও মর্মাহত না হয়ে পারিনা। শহীদদের জন্য আমাদের করার কিছু আছে। আর তা হলো শহীদী তামান্নায় উজ্জীবিত হয়ে দীন প্রতিষ্ঠার প্রচেষ্টা আরো শাণিত করা।”

মালিবাগের ঘটনার পরদিন ১৬ আগস্ট ইসলামী শাসনতন্ত্র ছাত্র আন্দোলন কেন্দ্রীয় কমিটির উদ্যোগে বিক্ষোভ ছিল রাজধানীর মুক্তাঙ্গনে। এতে হযরত পীর সাহেব চরমোনাই (রহ.) তাঁর বক্তব্যে জোট সরকারের কাছে চার দফা দাবী পেশ করেছিলেন। দাবীগুলো হলো-

১. খুনী তৌফিক, ছাত্রদল নেতা হানিফসহ খুনিদের গ্রেপ্তার করে অবিলম্বে বিচার,

২. খালেদা জিয়াকে নিঃশর্ত ক্ষমা প্রার্থনা,

৩. সরকারী জায়গায় যত মসজিদ আছে ঐ সকল জায়গাকে মসজিদের নামে ওয়াকফকরণ এবং

৪. শহীদ পরিবারকে যথাযথ ক্ষতিপূরণ দিতে হবে। কিন্তু দুঃখজনক বাস্তবতা হলো কোন দাবীই মানেনি জোট সরকার।

মালিবাগের শহীদ ভাইয়েরা আমাদের জন্য অনুপ্রেরণা। তাঁরা আমাদেরকে চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে গেছেন শাহাদাতের তামান্না কেমন হওয়া উচিত। তাঁরা আমাদের বুঝতে শিখিয়েছেন ক্ষমতাসীনদের মধুমাখা কথামালার পেছনে থাকে বিষাক্ত ও রক্তাক্ত কিছু নির্মম বাস্তবতা। শহীদ ভাইদের আত্মদান আমাদের কে শিখিয়েছে ক্ষমতার অংশীদার হওয়ার জন্য যারা নিজেদের বিক্রি করে দেয় তারা আসলে তাগুতের ক্রীড়নক হয়েই থাকে। অকপটে সত্য কথা বলা এবং সত্যের পক্ষে অবস্থান নেয়া তাদের পক্ষে সম্ভব হয়ে ওঠেনা।

মাঝেমাঝে আমার মনে প্রশ্নের উদ্রেক হয়, তৎকালীন ইসলামী মূল্যবোধের সরকারে যেসব ইসলামিস্টরা ছিলেন তারা পরবর্তীতে ইসলাম প্রতিষ্ঠার কথা বলে মানুষের কাছে কিভাবে দাঁড়িয়েছিলেন? তাদের কি আসলে অনুশোচনা, অনুতাপ কিংবা লজ্জা হয়েছিল? নাকি এমন একটি ঘটনাকে তারা আর কখনো মনেই করেনি? আমি বিশ্বাস করি হয়তো পৃথিবীতেই আল্লাহ তাআলা কথিত সেই ইসলামী মূল্যবোধের ধারক বাহকদের শহীদের রক্তের মূল্য বুঝিয়ে দিবেন। অন্যথায় আগামীকালের (পরকাল) জন্য তাদেরকে প্রস্তুতি নিতে হবে।

মালিবাগের শহীদদের রক্ত আমাদের শিরায় শিরায় উপলব্ধি করছি। তাদের মতোই শহীদি তামান্না বুকে নিয়ে হাজারো পার্থিব স্বপ্ন জলাঞ্জলি দিয়ে দ্বীন কায়েমের পথে নিজেকে উৎসর্গ করেছি। আল্লাহ তাআলা আমাদেরকে কবুল করুন। আমীন।

 

কেন্দ্রীয় প্রচার ও আন্তর্জাতিক সম্পাদক

ইসলামী শাসনতন্ত্র ছাত্র আন্দোলন

আপনার মতামত দিন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

     More News Of This Category