আজ ১৫ই কার্তিক, ১৪২৭ বঙ্গাব্দ, ৩১শে অক্টোবর, ২০২০ খ্রিস্টাব্দ

‘চরমোনাই মাহফিল’ সময়ের শ্রেষ্ঠ বাতিঘর

আসন্ন ঐতিহাসিক চরমোনাই মাহফিল বিশ্বের অন্যতম বৃহত্তম ইসলামী মহাসম্মেলন। বাংলাদেশসহ বিশ্বের নানা প্রান্ত হতে ধর্মপ্রাণ মানুষ এই মাহফিল অংশ নিচ্ছে। দীর্ঘ কয়েক যুগ ধরে লক্ষকোটি মানুষ এই মাহফিলের মাধ্যমে হেদায়াতের মিছিলে সমবেত হতে সক্ষম হয়েছে। চরমোনাই মাহফিলের রূহানী আমেজ দিনদিন অবিশ্বাস্য গতিতে বৃদ্ধি পাচ্ছে।

লক্ষ লক্ষ মানুষ নদীর স্রোতের মতো ছুটে আসেন কীর্তনখোলা নদীর তীরে। দিকভ্রান্ত পথহারা মানুষ এই ময়দানের বরকতে আল্লাওয়ালাদের কাতারে শামিল হওয়ার প্রতিযোগিতা করে। ইসলামের পরিপূর্ণ দিকনির্দেশনা নিয়ে ব্যক্তিগতজীবন, পারিবারিকজীবন, সামাজিকজীবন ও রাজনৈতিকজীবনে দীনি দীক্ষা নিয়ে সফল মুত্তাকী মানুষে পরিণত হয়।

এই মাহফিলকে কেন্দ্র করে দেশ-বিদেশের খ্যাতিমান শীর্ষ ওলামা হযরত আল্লাহওয়ালাদের মিলনমেলায় এসে অভিভূত হয়েছেন। দুনিয়ার মোহ, শয়তানের প্ররোচনায় রোগাক্রান্ত অন্তর, স্বার্থ ও মোহের ঘুর্ণাবর্তে পড়ে নষ্ট হওয়া এই জীবনকে রূহানিয়াতের নুরে ধুয়ে মুছে পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন করার জন্য এই মাহফিল হেদায়াতের কষ্টিপাথর। ইশকের আগুনে নিজের আমিত্বকে জ্বালিয়ে পুড়িয়ে নিজেকে খাঁটি সোনায় পরিণত করবার একটি মারাফাতের কারখানা। মাহফিলের তাকওয়াপূর্ণ পরিবেশ, চমৎকার শৃঙ্খলা, রূহানী বয়ান, মুজাহিদদের ক্ষণেক্ষণে জিকিরের ধ্বণিতে মনে হয় মহান আল্লাহ আসমান থেকে লক্ষ লক্ষ ফেরেস্তা নাযিল করেছেন!

যাদের সৌভাগ্য হয়েছে রূহানিয়াত ও জিহাদের এই উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র হবার তাদের কাছে আমার এই বর্ণনা কোনভাবেই যথেষ্ট নয়। কারণ মাহফিলে নবাগত মুজাহিদদের অনুভূতি, অল্পসময়ে তাদের জীবনের আমূল পরিবর্তন, পুরো ময়দানে জান্নাতি পরিবেশ, নুরের ঝলকানি, আসমান থেকে বর্ষিত আল্লাহ পাকের রহমত, প্রভুর সনে নিবেদিতপ্রাণ আশিকদের কলিজা নিংড়ানো আকুতি, জাহান্নামের ভয়ে পাগলদের বুকফাটা কান্না, অশ্রুসিক্ত ময়দান ও শায়খের মর্মস্পর্শী বয়ানের বর্ণনা দৃশ্যমান কাগজে কলমে তুলে আনা কখনো সম্ভব নয়! যারা এখনো এই মাহফিলে যাননি তারা বিশ্বাসই করবেন না যে এই ধরার বুকে এখনো আল্লাহ রহমত সরাসরি দেখতে পাওয়া যায়। দু একজন ব্যক্তি এই ঐতিহাসিক মাহফিল নিয়ে তীর্যক মন্তব্য করেন, চরমোনাই তরিকা নিয়ে না জেনে, না বুঝে সমালোচনা করেন, তাদের উচিত অন্তত একবার এই ময়দানে ঘুরে আসা। সরেজমিনে পর্যবেক্ষক করে বিরূপ মন্তব্য করা। তাদের জন্য সুযোগ ২৬, ২৭ ও ২৮ ফেব্রুয়ারি’২০ তিনদিন ব্যাপী এই মাহফিলে অংশগ্রহণ করা। সাথে সাথে যারা নিজের অন্তরকে সকল পাপাচার থেকে মুক্ত করে, বিশুদ্ধ আকিদা বিশ্বাস নিয়ে, শয়তানের সকল প্ররোচনাককে পদদলিত করে প্রকৃত আল্লাহর আশেক হয়ে ঈমান নিয়ে কবরে যেতে চাই তাদের জন্য এই মাহফিল সময়ের শ্রেষ্ঠ বাতিঘর।

অগ্রহায়ণ ও ফাল্গুন বছরে দু’বারে এই মাহফিল অনুষ্ঠিত হলেও কালের আবর্তনে ফাল্গুনের মাহফিলটি লোকসমাগম ও ওলামায়ে কেরামদের উপস্থিতির দিক দিয়ে প্রতি বছরই তার রেকর্ড ভেঙ্গে চলেছে। এখানে কত লক্ষ লোক উপস্থিত হয় ও ৩ দিন অবস্থান করে তা পুরোপুরি গণনা করা সম্ভব না হলেও এতটুকু আন্দাজ করা যায় যে, এতবড় জমায়েত দেশে বিশ্ব ইজতিমার পর আর কোথাও হয় না। মাদরাসা মাঠে মাহফিল হলেও মূলত এলাকা ব্যবহার হয় আরো বিশাল। মাদরাসা মাঠের পশ্চিমে থাকে বিশালাকার মূল প্যান্ডেল। কিন্তু এই মাঠ ছাড়াও পূর্বে, উত্তর ও দক্ষিণে আরো ৪টি মাঠ প্যান্ডেল সজ্জিত করা হয়। এগুলোর কোনো কোনো মাঠ মূল মাঠের চাইতে আয়তনে অনেক বড়। সবগুলো মাঠ কারো পক্ষে একত্রে পুরো ঘুরে আসা অসম্ভবের কাছাকাছি। আর সবগুলো মাঠই থাকে ৩ দিন অবস্থানকারীদের মাধ্যমে পূর্ণ, ভাসমান লোক এখানে খুবই নগন্য।

শুধু আয়তনেই এটি বৃহৎ তা-ই নয়। ওলামা-হযরতদের বরকতময় পদধুলির কারণে ইসলামবিমুখ অনেক মানুষ এখানে ৩ দিন থেকে সম্পূর্ণ ভিন্ন মানুষ হিসেবে বাসায় ফিরে গেছে এমন রেকর্ড অজস্র। এ তালিকায় যেমন আছে বিধর্মীরা তেমনি আছে নাস্তিক, শীর্ষ সন্ত্রাসী, নেশাখোর, চোর-ডাকাতের সর্দাররা। জেনারেল মাধ্যমে পড়াশুনা করা দ্বীনবিমুখ অনেক প্রথিতযশা ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার, প্রফেসর, আইনজীবীও এখানে এসে আজ আদর্শ মানুষে পরিবর্তিত।

মানুষ যখন অসুস্থ হয় তখন ডাক্তারের নিকট যেতে হয়, ডাক্তারের প্রেসকিপশন অনুযায়ী ঔষধ সেবন করে আমরা সুস্থ হই। আমরা মুসলমান! গুনাহ করতে করতে আমাদের আত্মায় যখন ব্যধি হয়, তখন এই ব্যধি দূর করার জন্য আমরা হক্কানী ওলামায়ে কেরাম ও পীর-মাশায়েখদের নিকট যাই। আপনি যখন বরফের নিকট যাবেন তখন ঠান্ডা অনুভূত হবে। আবার আগুনের নিকট গেলে গরম অনুভূত হবে। ঠিক তেমনি আপনি যখন হক্কানী ওলামায়ে কেরাম ও পীর-মাশায়েখদের নিকট যাবেন, তাদের বয়ান শুনবেন তখন আপনার অন্তরে আল্লাহর ভয় তৈরি হবে এবং আপনি ইবাদতের প্রতি মনোযোগী হবেন। অর্থাৎ আপনার আমল আখলাকের উন্নতি হবে।

ঐতিহাসিক চরমোনাই বার্ষিক মাহফিলে ইতিপূর্বে যারা গিয়েছেন তারা বুঝতে পেরেছেন কার কতটুকু ফায়দা হয়েছে। যে ব্যক্তি একবার মধু খেয়েছে সে বলতে পারবে মধু কতটুকু মিষ্টি বা এর উপকারিতা কি। যে ব্যক্তি মধু খাননি তিনি বলতে পারবেন না তার উপকারিতা কি। লক্ষ লক্ষ মানুষ সেখানে গিয়ে নিজের আমল আখলাকের উন্নতি করেছেন।

দেশের শীর্ষ ওলামা-মাশায়েখ, দেওবন্দী বুজুর্গানে দ্বীন এ মাঠে গিয়ে ঘোষণা দিয়ে এসেছেন- এটি একটি মকবুল মারকাজ, তাদের দোয়ার বরকতেই বোধহয় চরমোনাইবিরোধী অনেক প্রপাগান্ডা চললেও এখানে আল্লাহওয়ালা মানুষ ও ওলামায়ে কেরামদের পদচারনা দিনদিন বেড়েই চলেছে। আল্লামা শামসুল হক ফরিদপুরী, বায়তুল মোকাররম জাতীয় মসজিদের খতীব আল্লামা ওবায়দুল হক, শাইখুল হাদীস আল্লামা আজিজুল হক, মুফতী ফজলুল হক আমিনী, আল্লামা গিয়াস উদ্দিন শায়খে বালিয়া (রহ.) এ মাঠে গিয়ে নসীহত করেছেন। গিয়েছেন, নসীহত করেছেন, উদ্দীপনা যুগিয়ে সামনে এগুতে বলেছেন আল্লামা আব্দুর রহমান, হাটহাজারীর আল্লামা শাহ আহমদ শফী, আল্লামা মাহমুদুল হাসান, আল্লামা নূরুল ইসলাম ওলিপুরী, নানুপুরী হযরত সহ অসংখ্য শায়খুল মাশায়েখগণ (দা.বা.)। এছাড়া সৌদি আরব, বাহরাইন-সহ বিশ্বের শীর্ষ আলেমরা এসেছেন।

সম্মানিত দেশবাসী, এখনও যাদের যাওয়ার সুযোগ হয়নি তারা আসুন না, ৪ দিনের সময় নিয়ে চরমোনাই’র এ মকবুল মাহফিলে যাই। দেশ ও জাতিকে সুন্নতে নববীর আদর্শে প্রস্তুত করতে শামিল হই এ কাফেলার সাথে। আর যদি অনেকের বক্তব্য অনুযায়ী এখানে কোনো বদদ্বীনি কাজের নমুনা খুজে না পাই, তাও প্রচার করে সবাইকে বিভ্রান্ত না হতে সচেতন করি। আল্লাহ আমাদেরকে শয়তানের ওয়াস্‌ওয়াসা থেকে বেঁচে দ্বীনের উপর আমৃত্যু অটল থাকার তৌফিক দিন, আমীন।

 

আপনার মতামত দিন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

     More News Of This Category